সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভোমরা ইউনিয়নের বৈচনা গ্রামে দুই সন্তানের জননী নিপা খাতুন রুনা (৩২)-এর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় পরিবার ও স্বজনদের একাংশ হত্যার অভিযোগ তুললেও স্বামীর দাবি, এটি আত্মহত্যার ঘটনা। ফলে ‘হত্যা না আত্মহত্যা’—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা ও নানা ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৈচনা গ্রামের বাসিন্দা মুজাফফর হোসেনের সঙ্গে প্রায় ১৪ বছর আগে নিপা খাতুন রুনার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে ইমরান হোসেন (১২) ও ইব্রাহিম হোসেন (৮) নামে দুই সন্তান রয়েছে। দীর্ঘদিনের সংসার জীবনের পর হঠাৎ করে গৃহবধূর এই মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে গভীর শোকের পাশাপাশি রহস্যেরও জন্ম দিয়েছে।

নিহতের বাবা আওরঙ্গজেব অভিযোগ করে বলেন, তার মেয়েকে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো। তিনি দাবি করেন, স্বামীর কথিত পরকীয়া সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তাদের সংসারে প্রায়ই অশান্তি লেগে থাকত। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নিয়মিত ঝগড়া-বিবাদ হতো।

তিনি আরও বলেন, গত ৭ জুন রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। তার অভিযোগ, ওই ঘটনার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে তার মেয়েকে বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করার চেষ্টা করা হয়।

নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, অসুস্থ অবস্থায় রুনাকে প্রথমে স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তবে নিহতের স্বামী মুজাফফর হোসেন এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সদস্য এবং বর্তমানে ছুটিতে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। তার দাবি, বিদেশে কুয়েত মিশনে যাওয়ার বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে কিছুটা মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়েছিল।

মুজাফফর হোসেন বলেন, ৭ জুন রাতে অভিমান করে আমি খাবার না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন সকালে স্ত্রী আমাকে খাবার খেতে ডাকলেও আমি খাইনি। এতে অভিমান করে সে বিষপান করে। পরে সে নিজেই আমাকে বিষয়টি জানায়। এরপর আমি দ্রুত তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই। এটি আত্মহত্যার ঘটনা, এখানে কোনো হত্যাকাণ্ড বা পরকীয়ার বিষয় নেই।

ঘটনার খবর পেয়ে সদর থানা পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করে। পরে মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয় এবং ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং সেই অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর বৈচনা গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন এটি পারিবারিক কলহের জের ধরে আত্মহত্যার ঘটনা, আবার অন্যরা এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করছেন। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

দুই সন্তানের মায়ের অকাল মৃত্যুতে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে রহস্যঘেরা এই ঘটনাটি এখন পুরো এলাকার মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পুলিশ বলছে, তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনই এ ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করবে।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024