দুর্নীতিমুক্ত দ্রুত সেবায় স্বস্তি ফিরেছে জমির মালিকদের মাঝে

বাংলাদেশে ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা, হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির অভিযোগ বহু পুরোনো। একটি নামপত্তন করাতে মাসের পর মাস ঘুরতে হতো সাধারণ মানুষকে। খাজনা পরিশোধ কিংবা জমির কাগজপত্র সংশোধনের মতো সাধারণ কাজও অনেক সময় মানুষের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠত। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারাবাহিকতায় এখন ভূমি ব্যবস্থাপনাতেও দৃশ্যমান পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে।

গত ১৯ মে থেকে ২১ মে-২০২৬ পর্যন্ত দেশব্যাপী পালিত হয়েছে “ভূমি সেবা সপ্তাহ”। এরই অংশ হিসেবে সাতক্ষীরাতেও তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী এই সেবামূলক কার্যক্রম। জেলা প্রশাসক চত্বরে আয়োজিত এ সেবা সপ্তাহ যেন একসময় ছোট্ট একটি জনকল্যাণ মেলায় পরিণত হয়েছিল। মানুষের ভিড়, তথ্যসেবা, অনলাইন সহায়তা, নামপত্তন নিষ্পত্তি, খাজনা পরিশোধ ও জমি সংক্রান্ত সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানে উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে পুরো আয়োজনজুড়ে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস, সদর ভূমি অফিস, সদর এসিল্যান্ড অফিস, জেলা প্রশাসন ও জেলা তথ্য অফিস যৌথভাবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত প্রচণ্ড জ্যৈষ্ঠের গরম উপেক্ষা করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রম ছিল চোখে পড়ার মতো। পুরনো লেজার খাতা, নামজারি নথি, কম্পিউটার ও অনলাইন সার্ভারের মাধ্যমে একসাথে আধুনিকতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার এক মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল সেখানে।

ভূমি সেবা সপ্তাহে মূলত অনলাইনে নামপত্তনের আবেদন গ্রহণ, দ্রুত নামজারি সম্পন্ন করা, খাজনা পরিশোধ, জমি সংক্রান্ত তথ্য যাচাই, রেকর্ড সংশোধন এবং সাধারণ মানুষের বিভিন্ন অভিযোগ ও সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনেকেই প্রথমবারের মতো এত সহজে ও স্বল্প সময়ে ভূমি সংক্রান্ত সেবা পেয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

গতকাল শেষদিনে জেলা প্রশাসক চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বদরুদোজ্জা নিজেই সাধারণ মানুষের পাশে বসে সেবার কার্যক্রম তদারকি করছেন। সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলছেন, অভিযোগ শুনছেন এবং দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দিচ্ছেন। প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে সরাসরি মাঠে বসে জনগণের সেবা দিতে দেখে অনেকেই সন্তোষ প্রকাশ করেন।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) বদরুদোজ্জা বলেন,

“মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জনগণকে হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছ ভূমি সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। নামপত্তনের আবেদন পাওয়ার পর দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। কোনো দুর্নীতি বা অনিয়মের সুযোগ নেই। কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

সদর ভূমি অফিসের প্রধান সহকারী ভূমি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সরকার বলেন,

“আমরা চেষ্টা করছি মানুষ যাতে দ্রুত ও সহজে নামপত্তন ও খাজনা পরিশোধের সেবা পান। ভূমি অফিস নিয়ে মানুষের দীর্ঘদিনের যে ভীতি বা নেতিবাচক ধারণা ছিল, সেটি দূর করার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। কোনো দুর্নীতির সুযোগ নেই, আর কেউ অনিয়ম করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ভূমি সেবা সপ্তাহে সেবা নিতে আসা শহরের কামালনগরের বাসিন্দা আমিরুজ্জামান বাবু বলেন,

“এত কম সময়ে যে নামপত্তন করা যায়, তার প্রমাণ আমি নিজেই। আগে ভাবতাম মাসের পর মাস ঘুরতে হবে। কিন্তু এবার খুব দ্রুত ও কোনো ধরনের অনিয়ম ছাড়াই আমার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আমি সরকার, সদর ভূমি অফিস ও এসিল্যান্ডকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। সরকারের এই স্বচ্ছ উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।”


জেলা প্রশাসন ও জেলা তথ্য অফিসের কর্মকর্তারাও নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। তথ্যসেবা বুথে সাধারণ মানুষকে অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া, খাজনা পরিশোধের নিয়ম ও ডিজিটাল ভূমি সেবার নানা দিক সম্পর্কে সচেতন করা হয়। অনেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই অনলাইনে আবেদন ও খাজনা পরিশোধের পদ্ধতি শিখে নেন।

বিশ্ব গণমানুষের সেবা ফাউন্ডেশন সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি শেখ সিদ্দিকুর রহমান ভুমি সেবা মেলা থেকে থেকে ফিরে এসে জানান,  "সরকার একটা সুন্দর পদক্ষেপ নিয়ে জনগণের ভোগান্তি ও দুর্নীতি অনিয়ম থেকে একটা সোজা পথ দেখিয়েছে"। 

দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অফিস মানেই ছিল দালাল, ঘুষ ও হয়রানির অভিযোগ। কিন্তু সাতক্ষীরার এই ভূমি সেবা সপ্তাহে প্রশাসনের আন্তরিকতা ও সেবার মানসিকতা সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। জনগণের দোরগোড়ায় দ্রুত, স্বচ্ছ ও মানবিক সেবা পৌঁছে দিতে পারলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়—এ কথা আবারও প্রমাণিত হলো এই আয়োজনের মাধ্যমে।

সাতক্ষীরার ভূমি কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা, নিষ্ঠা ও জনবান্ধব আচরণ এ সেবা সপ্তাহকে শুধু একটি প্রশাসনিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং এটি হয়ে উঠেছে জনসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই যেন ছিল তাদের একমাত্র ব্রত।

ভূমি সেবা সপ্তাহ শেষ হলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—এই সেবার ধারাবাহিকতা সারা বছর জুড়েই অব্যাহত থাকবে। কারণ একটি দুর্নীতিমুক্ত, দ্রুত ও মানবিক ভূমি ব্যবস্থা কেবল প্রশাসনিক উন্নয়ন নয়, এটি একটি সভ্য ও জনবান্ধব রাষ্ট্র গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024