মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে বেইজিং পৌঁছেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পরাশক্তির মধ্যে গভীর উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যেই এ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে এএফপির সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন।


বেইজিং থেকে এএফপি জানায়, ওয়াশিংটন থেকে দীর্ঘ যাত্রা শেষে প্রেসিডেন্টের বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ান বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।


প্রায় এক দশকের মধ্যে এটিই কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর। 


বুধবার বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য চীনের বাজার ‘উন্মুক্ত’ করার আহ্বান জানাবেন। উচ্চঝুঁকির এ শীর্ষ বৈঠকে ইরান যুদ্ধের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।


এএফপি জানায়, ব্যবসাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং আলাস্কায় যাত্রাবিরতির সময় এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন। টেসলার প্রধান ইলন মাস্কও প্রেসিডেন্টের বিমানেই চীন সফরে যাচ্ছেন।


ওয়াশিংটন ত্যাগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, ‘আমি অসাধারণ মর্যাদাসম্পন্ন নেতা প্রেসিডেন্ট সিকে বলব যেন তিনি চীনকে উন্মুক্ত করেন, যাতে এসব মেধাবী মানুষ তাদের জাদু দেখাতে পারে এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে সহায়তা করতে পারে।’


অ্যাপলের প্রধান টিম কুকসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহীও এ সফরে বেইজিংয়ে থাকবেন। প্রায় এক দশকের মধ্যে এটিই কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর।


তবে বাণিজ্য সম্প্রসারণে ট্রাম্পের পরিকল্পনার সামনে তাইওয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসংক্রান্ত রাজনৈতিক উত্তেজনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব কারণেই মার্চে নির্ধারিত সফরটি পিছিয়ে গিয়েছিল।


হোয়াইট হাউস ত্যাগের সময় ট্রাম্প বলেন, ইরান ইস্যুতে তার সঙ্গে সি চিনপিংয়ের ‘দীর্ঘ আলোচনা’ হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরানি তেলের বড় ক্রেতা হচ্ছে চীন।


তবে তিনি মতপার্থক্যকে তেমন গুরুত্ব দেননি। সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি না, ইরান বিষয়ে চীনের কোনো সহায়তা আমাদের প্রয়োজন।’ একইসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সি ‘তুলনামূলকভাবে ভালো’ আচরণ করেছেন।


চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার ট্রাম্পের সফরকে ‘স্বাগত’ জানিয়ে বলেছে, ‘সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং মতপার্থক্য ব্যবস্থাপনায়’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে চীন প্রস্তুত।


তবে বেইজিং ক্রমেই শান্তিচুক্তির বিষয়ে অধৈর্য হয়ে উঠছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই মঙ্গলবার তার পাকিস্তানি সমকক্ষকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।


২০১৭ সালের পর এটাই ট্রাম্পের প্রথম বেইজিং সফর। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সি চিনপিংয়ের সঙ্গে তার বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক ছাড়াও থাকছে জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আয়োজন।


ব্যস্ত সফরসূচিতে রয়েছে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে রাষ্ট্রীয় ভোজ এবং চা-আড্ডা।


ট্রাম্প সোমবার জানান, তিনি তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়েও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কথা বলবেন। চীনের দাবি করা স্বশাসিত দ্বীপটির প্রতি সমর্থন বিষয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে পরামর্শ না করার মার্কিন ঐতিহ্যগত অবস্থান থেকে এটি একটি ভিন্নধর্মী ইঙ্গিত।


বিরল খনিজ রপ্তানিতে চীনের নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে প্রতিযোগিতা এবং দুই দেশের উত্তপ্ত বাণিজ্য সম্পর্কও বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির নেতাদের আলোচনায় আসতে পারে।


দুই দেশ তাদের শুল্কযুদ্ধের এক বছরের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা করবে। গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় সর্বশেষ বৈঠকে ট্রাম্প ও সি এ সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন।


শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে উত্তেজনার চিত্র ইতোমধ্যেই বেইজিংয়ের রাস্তায় দেখা গেছে। এএফপির সাংবাদিকেরা দেখেছেন, পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নজরদারি করছে এবং মেট্রোযাত্রীদের পরিচয়পত্র পরীক্ষা করছে।


পূর্বাঞ্চলীয় নানজিং শহর থেকে আসা ২৪ বছর বয়সী ওয়েন ওয়েন এএফপিকে বলেন, ‘এটা অবশ্যই বড় ব্যাপার।’


তিনি বলেন, ‘অবশ্যই কিছু অগ্রগতি হবে।’ সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও চীন ও যুক্তরাষ্ট্র ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তি’ নিশ্চিত করতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে একে অপরকে দেখলেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করে আসছে।


ট্রাম্প বারবার সি চিনপিংয়ের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। সোমবার তিনি দাবি করেন, এই সম্পর্কই তাইওয়ানে সম্ভাব্য চীনা আগ্রাসন ঠেকাবে।


তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় সব ঠিক থাকবে। প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। তিনি জানেন, আমি এমন কিছু ঘটতে দিতে চাই না।’


তাইওয়ান ও এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা ওয়াশিংটনের সমর্থন দুর্বল হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় কি না তা দেখতে ট্রাম্পের সফর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।


২০১৭ সালের ট্রাম্প সফরের পর থেকে বেইজিং আরও আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ় অবস্থানে গেছে। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে গিয়ে ট্রাম্প তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন।


তবে এই সম্মেলন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন চীনের অর্থনীতিও অনিশ্চয়তার মুখে। অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় কমে যাওয়া এবং একসময় সমৃদ্ধ আবাসন খাতে দীর্ঘস্থায়ী ঋণসংকটে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের অর্থনীতি চাপের মুখে রয়েছে।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024