যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠে এখন সোনালী ধানের সমারোহ। চারদিকে নবান্নের ঘ্রাণ থাকার কথা থাকলেও কৃষকের চোখেমুখে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর বৈরী আবহাওয়ায় বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন উপজেলার হাজার হাজার কৃষক। একদিকে আকাশের কালো মেঘের গর্জন, অন্যদিকে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়া উৎপাদন খরচ—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছেন নারিকেলবাড়ীয়া ইউনিয়নসহ উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তের চাষিরা।

চলতি মৌসুমে বাঘারপাড়ার কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে দাঁড়িয়েছে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের অস্বাভাবিক ব্যয়। স্থানীয় কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতিকূল আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে শ্রমিকরা আকাশচুম্বী মজুরি দাবি করছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিঘা প্রতি ধান কেটে ঘরে তুলতে কৃষকের খরচ হচ্ছে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা।নারিকেলবাড়ীয়া এলাকার একাধিক কৃষক জানান, স্বাভাবিক সময়ে বিঘা প্রতি যে খরচ ৪-৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, এখন তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিক সংকট এতটাই তীব্র যে, চড়া মজুরি দিয়েও সময়মতো লোক পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে গিয়ে শ্রমিকদের অনুরোধ করে নিয়ে আসতে হচ্ছে।

সরেজমিনে নারিকেলবাড়ীয়া ও এর আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টির ফাঁকে রোদ হাসলেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ছেন কিষাণ-কিষাণীরা। নিচু এলাকার জমিগুলোতে বৃষ্টির পানি জমে কাদা হয়ে যাওয়ায় কাজ করা হয়ে পড়েছে দুরূহ। কর্দমাক্ত জমি থেকে ধান কেটে মাথায় করে বা কাঁধে বহন করে উঁচু রাস্তায় বা বাড়িতে নিয়ে আসতে ঘাম ঝরছে কৃষকদের।মাঠে কর্মরত এক প্রান্তিক চাষি আক্ষেপ করে বলেন, *"মাঠের ধান ঘরে নিতে এবার রক্ত জল করা টাকা দিতে হচ্ছে। বিঘায় ৮-৯ হাজার টাকা খরচ করে ধান তোলার পর সারের দাম আর সেচ খরচ যোগ করলে আমাদের হাতে আর কিছুই থাকে না। আমাদের লাভ তো দূরের কথা, পুঁজি বাঁচানোই এখন বড় যুদ্ধ।"*

সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন বর্গাচাষিরা। চড়া দামে সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পর এখন ধান কাটার এই বাড়তি খরচ তাদের ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলছে। স্থানীয় বাজারের বর্তমান ধানের দাম (মণপ্রতি ১০০০-১১০০ টাকা) হিসাব করলে, এই খরচ মেটানোর পর চাষির গোলা শূন্য থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের দাবি, সরকারের পক্ষ থেকে ধান কেনার দাম পুনর্মূল্যায়ন না করলে কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে।উপজেলায় কৃষি যন্ত্রপাতির কিছু ব্যবহার থাকলেও টানা বৃষ্টিতে মাঠ ভিজে থাকায় অনেক জায়গায় ‘কম্বাইন হারভেস্টার’ মেশিন নামানো যাচ্ছে না। ফলে নিরুপায় হয়ে কৃষকদের সেই সনাতন পদ্ধতিতে শ্রমিকের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে, যা খরচ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার বাঘারপাড়ায় ধানের ফলন লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ভালো হয়েছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি মাথায় রেখে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে—ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেলেই যেন তা দ্রুত কেটে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। প্রয়োজনে পলিথিন বা ত্রিপল ব্যবহার করে ধান ঢেকে রাখারও পরামর্শ দিচ্ছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা।বাঘারপাড়ার প্রতিটি গ্রামে এখন একটাই দৃশ্য—আকাশের কালো মেঘের দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে দ্রুত সোনালী স্বপ্নটুকু রক্ষা করার প্রাণান্তকর সংগ্রাম। প্রকৃতির এই বৈরিতার মুখেও ঘাম ঝরানো ফসল ঘরে তুলতে এক সেকেন্ড সময় নষ্ট করার ফুসরত নেই এ অঞ্চলের অদম্য কৃষকদের।


প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024