মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ, কচি পাটগাছ বাতাসে দোল খাচ্ছে। কিন্তু এই দৃশ্যের পেছনের গল্পটা ভিন্ন—এ যেন সংকটকে জয় করার এক নিঃশব্দ বিপ্লব। মাদারীপুরের শিবচরে জ্বালানি তেলের সংকট যেখানে কৃষকদের হতাশার কিনারায় ঠেলে দিয়েছিল, সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে এক নতুন সম্ভাবনা—‘বিনা চাষে পাট চাষ’।

কয়েক সপ্তাহ আগেও চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। জমি প্রস্তুতের জন্য ট্রাক্টর চালাতে প্রয়োজনীয় তেলের অভাব, আর তার সঙ্গে বাড়তি খরচ সব মিলিয়ে পাট চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন কৃষকরা। অনেকেই ভাবছিলেন, এবার হয়তো পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু কৃষকেরা থেমে থাকেননি। সংকটকে চ্যালেঞ্জ করেই খুঁজে নিয়েছেন বিকল্প পথ।

শিবচর উপজেলার বাশকান্দি ইউনিয়নের মির্জাকান্দি এলাকায় ও বহেরাতলা উত্তর ইউনিয়নের চরগজারীয়া ও পুরারটেক এলাকায়  গিয়ে দেখা যায়, চাষ ছাড়াই জমিতে সরাসরি পাট বপন করছেন কৃষকরা। প্রচলিত নিয়মে যেখানে জমি বারবার চাষ দিয়ে মাটি প্রস্তুত করা হয়, সেখানে এই নতুন পদ্ধতিতে সেই ধাপ পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে যেমন তেলের ব্যবহার কমেছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।

স্থানীয় কৃষক এসাহাক বেপারী বলেন, “তেলের সংকটে জমি চাষ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পরে দেখি, আশপাশের কিছু কৃষক বিনা চাষেই পাট বুনেছে। আমিও চেষ্টা করি। এখন পর্যন্ত গাছের অবস্থা ভালোই মনে হচ্ছে।”

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান আব্দুল গনি মিয়া। তার ভাষায়, “আমাদের এলাকায় কয়েক একর জমিতে এই পদ্ধতিতে পাট হয়েছে। শুরুতে ভয় ছিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সিদ্ধান্তটা ঠিকই ছিল।”

কৃষকদের এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে পূর্ব অভিজ্ঞতা। কয়েক বছর ধরে তারা বিনা চাষে রসুন ও পেঁয়াজ চাষ করে আসছেন। সেই সফলতাই তাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে—প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়েও কৃষি সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বিনা চাষে চাষ’ বা জিরো টিলেজ পদ্ধতি বিশ্বজুড়েই ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এতে মাটির স্বাভাবিক গঠন অক্ষুণ্ণ থাকে, জৈব উপাদান নষ্ট হয় না এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা বজায় থাকে। পাশাপাশি, কম যান্ত্রিক ব্যবহারের ফলে কার্বন নিঃসরণও কমে, যা পরিবেশের জন্য ইতিবাচক। তবে এই পদ্ধতির সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর—মাটির ধরন, আগাছা নিয়ন্ত্রণ, সঠিক সময়ে বপন এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা। 

শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, “বিনা চাষে পাট চাষ পদ্ধতি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে, তবে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব একটি বিকল্প হতে পারে। বিষয়টি আরও কার্যকর ও টেকসই করতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা জরুরি। আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছি।”

পাট—যাকে একসময় বলা হতো ‘সোনালী আঁশ’—বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব তন্তুর চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাটের গুরুত্বও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে কম খরচে অধিক উৎপাদনের এমন উদ্যোগ দেশের পাটখাতকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

শিবচরের এই পরিবর্তন তাই শুধু একটি অঞ্চলের কৃষি পদ্ধতির রূপান্তর নয়; এটি একটি বড় বার্তা—সংকটই কখনও কখনও নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়। মাঠের কৃষকরা দেখিয়ে দিচ্ছেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও উদ্ভাবনের পথ খোলা থাকে।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষির এই অভিযোজন যদি সফল হয়, তবে ‘বিনা চাষে পাট চাষ’ শুধু শিবচরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে দেশের বিভিন্ন পাট উৎপাদনকারী অঞ্চলে। আর তখন হয়তো আবারও নতুন করে জেগে উঠবে বাংলাদেশের সেই চিরচেনা পরিচয়—সোনালী আঁশের দেশ।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024