বাংলাদেশে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের সামনে এক বিশাল ও কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ।


সংস্থাটি জানিয়েছে, এই মুহূর্তে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং বিশৃঙ্খলা এড়াতে বিএনপিকে দ্রুত অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সংস্কারে হাত দিতে হবে।


 বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রকাশিত 'বাংলাদেশ’স নিউ গভর্নমেন্ট গেটস ডাউন টু বিজনেস' শীর্ষক এক ব্রিফিংয়ে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।


ক্রাইসিস গ্রুপ বলছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এবং জুলাই সনদের ওপর গণভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মাইলফলক। শেখ হাসিনার পতনের পর ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটেছে। এজন্য রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন ও নিরাপত্তা বাহিনী ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে ভোটের দুই মাস পর এখন চ্যালেঞ্জের প্রকৃত রূপটি স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।


সংস্থাটির সিনিয়র কনসালটেন্ট থমাস কিন বলেন, "বিএনপির জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানো। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও সারের আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়তে পারে। যদি সরকার এই সংকট মোকাবিলা করে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারে, তবে দেশ আবার অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে।"


প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো পোশাক খাত ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্স আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি সংকটে দেশের সার কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং লোডশেডিং বাড়ছে। ২০২৬ সালে জ্বালানি আমদানির খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জনগণকে স্বস্তি দিতে না পারলে বিএনপির প্রতি জনসমর্থন দ্রুত কমে যেতে পারে।


ক্রাইসিস গ্রুপ বিএনপিকে পরামর্শ দিয়েছে, তারা যেন অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করে। পরামর্শে বিশেষ করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিএনপিকে বাস্তবসম্মত চিন্তা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের মতো দীর্ঘদিনের পুরনো দলকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ রাখা টেকসই হবে না। বরং তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো পর্যালোচনা করা এবং সংস্কার ইস্যুতে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলা উচিত।


অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে সংস্থাটি জানায়, বিগত সরকারের আমলের দুর্নীতি ও ব্যাংক খাতের অনিয়মের কারণে অর্থনীতি এমনিতেই চাপে ছিল। বিএনপি তাদের প্রথম ১৮০ দিনের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তা বাস্তবায়নের জন্য তাদের হাতে সময় খুব কম। বিশেষ করে তারুণ্যের যে আকাঙ্ক্ষা থেকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘটেছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণই হবে এই সরকারের জনপ্রিয়তার আসল মাপকাঠি।


ক্রাইসিস গ্রুপ পরিশেষে সতর্ক করে বলেছে, বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবেই ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দ্রুত জনমত গড়ে ওঠার প্রবণতা রয়েছে। তাই বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে তারা কেবল ক্ষমতায় ফেরার জন্যই রাজনীতি করছে না, বরং রাষ্ট্র সংস্কারে তারা আন্তরিক। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে কয়েক লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্রসীমার নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকানোই হবে নতুন সরকারের জন্য অগ্নিপরীক্ষা।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024