|
Date: 2026-04-17 21:39:43 |
◼️ অমিত হাসান : যেকোনো দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হচ্ছে তাদের নতুন প্রজন্ম। একটি দেশের ভবিষ্যত কোনদিকে যাচ্ছে তার অনেকটাই নির্ভর করে দেশটির নতুন প্রজন্ম কোনদিকে যাচ্ছে, কীভাবে বেড়ে ওঠছে তার উপর। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও যেকোনো সূচকেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় দেশগুলোর একটি। এদেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠীই বয়সে তরুণ। তাঁরা সাহসী, মেধাবী এবং অক্লান্ত পরিশ্রমী । এই তরুণদের হাত ধরেই বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ হতে চায়। কিন্তু আমাদের এই তারুণ্যকে ধ্বংস করতে দেশে- বিদেশে সমানতালে চলছে ষড়যন্ত্র। তাঁরা আমাদের নতুন প্রজন্মের হাতে মাদক দিয়ে তাঁদের করছে বিপথগামী। যে বয়সে তাঁদের কথা ছিল দিগন্ত জয়ের স্বপ্ন দেখার, সে বয়সে তাঁরা মাদকের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। অবস্থাটা একরকম এমন হয়েছে যে, আমাদের নতুন প্রজন্মের মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার চেয়ে মাদক বেশি সহজলভ্য হয়ে যাচ্ছে। একদিকে মাদক ব্যবসায়ীরা মাদকের টাকায় অট্টালিকা বানাচ্ছে, আর আমাদের কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকার কূপে।
মাদক শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিকেই ধ্বংস করে না। ধ্বংস করে দেয় একটি পরিবার, একটি সমাজ। সাম্প্রতিক সময়ে পত্রিকা খুললেই ভয়াবহ সব শিরোনাম চোখে পড়ে। যেগুলো একজন সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষ তার সবচেয়ে ঘৃণিত শত্রুর জন্যও কামনা করে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে মাদকাসক্তদের ৮০ শতাংশই কিশোর-তরুণ। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। মাদকাসক্তরা মাদকের টাকার জন্য চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি করে বেড়াচ্ছে দিনের পর দিন। এমনকি কাউকে হত্যা করতেও বাঁধছে না তাদের। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায় মাদকাসক্ত ব্যক্তি মাদকের নেশায় তার নিজের পরিবারের সদস্যদের হত্যার মতো ঘৃণ্য কাজও করে ফেলছে নির্দ্বিধায়। তাছাড়া মাদকাসক্ত ব্যক্তিটির অন্যায় আবদার বা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার খবরও নিয়মিতই আসছে পত্রিকার পাতায়।
অর্থাৎ একজন মাদকাসক্ত তাঁর পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবার জন্যই বোঝা স্বরুপ। কিন্তু তাঁদের এই অবস্থার জন্য কি সমাজের কোনো দায় নেই? আর মাদকাসক্তরাও তো এ দেশেরই নাগরিক। তাঁদের সুপথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও কি রাষ্ট্রকে নিতে হবে না?
পৃথিবীতে কবে, কখন, কোথায়, কীভাবে মাদকের প্রচলন শুরু হয়েছিলো তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে ধারণা করা হয়, অতি প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ না চাইতেও মাদকের উপস্থিতি টের পায়। সে সময় মানুষ যখন বনে-জঙ্গলে খাবারের সন্ধান করত, তখন তারা এমন কিছু উদ্ভিদ (যেমন: পপি ফুল, কোকা পাতা, বিভিন্ন লতা-গুল্ম) খুঁজে পায় যা খেলে শারীরিক ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে সুমেরীয়রা আফিম চাষ করত এবং একে ‘আন-গিল’ বা ‘আনন্দের উদ্ভিদ’ বলে ডাকত। ইনকা সভ্যতার মানুষ কোকা পাতা চিবাত। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে ‘সোমরস’ নামক এক পানীয়ের কথা উল্লেখ থাকার দাবিও করে কেউ কেউ, যা যজ্ঞ বা ধর্মীয় উৎসবে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশের সাথেও মাদকের সম্পর্ক বেশ পুরনো। পর্তুগিজ পর্যটক পাইরেসের লেখায় আফিমের উল্লেখ পাওয়া যায়। বস্তুত সে সময়ে মাদকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল কেবল ধনীক শ্রেণির লোকেদের এবং তা সাধারণের মাঝে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও ছিল কম। তবে সময়ের সাথে মাদক পৌঁছে গেছে সাধারণের দোরগোড়ায়। বিশেষ করে এ অঞ্চলে ইউরোপীয়দের প্রভাব বিস্তারের পর। এমনকি আফিমের ব্যবহার নিয়ে চীন ও ব্রিটেনের মধ্যে যুদ্ধও হয়। যা ইতিহাসে আফিম যুদ্ধ নামে পরিচিত। আমাদের এই বঙ্গেও ইংরেজ আমলে মাদকের ভয়াবহতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়। তারপর ৪৭ এ দেশভাগ হওয়ার পর এবং ১৯৭১ এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করেছে। কিন্তু তাতেও দেশে মাদকের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হয় নি। বরং যত দিন যাচ্ছে মাদক ততই ভয়াবহ হয়ে ওঠছে দেশজুড়ে। শহর থেকে গ্রাম, অলি থেকে গলি, স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কর্মস্থলেও পৌঁছে গেছে মাদক। ফাওলার নামের একজন গবেষক মাদকাসক্তদের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পান মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের স্মৃতিকেন্দ্র, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অংশ, আচার-ব্যবহার নিয়ন্ত্রনের অংশবিশেষ স্বাভাবিক থাকে না।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমাদের নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। বাবা-মায়ের উচিত সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তারা কাদের সাথে মিশছে সেদিকে খেয়াল রাখা। পাড়া-মহল্লায় মাদকবিরোধী কমিটি গঠন এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করে নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখার মাধ্যমেও মাদক থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা যায়। এছাড়া নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা মাদকের প্রতি অনীহা তৈরি করতে সাহায্য করে। সীমান্তবর্তী এলাকা এবং যে এলাকাগুলোয় মাদকের সহজলভ্যতা বেশি সে এলাকাগুলো চিহ্নিত করে মাদকের সিন্ডিকেট সমূলে উৎপাটন করতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী ও গডফাদারদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নতুন প্রজন্মের জন্য সুস্থ বিনোদনের পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা ও খেলার মাঠের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা। নতুন প্রজন্ম যদি ছোট থেকেই নৈতিকা শিক্ষা, শরীরচর্চা ও খোলা আকাশের নিচে মুক্ত বাতাসে বেড়ে ওঠতে না পারে তবে মাদক সিন্ডিকেট তাদের খুব সহজেই টার্গেট করতে পারবে । সর্বোপরি মাদকের সিন্ডিকেট হয়তো আমাদেরই কারো ভাই-বোন, বন্ধু, প্রতিবেশী বা আত্মীয়কে টার্গেট করে রেখেছে। তাই আমরা যদি আজ সমাজ থেকে এই অন্ধকার না তাড়াই, তবে কাল সেই অন্ধকারের হাত আমাদের দরজায়ই কড়া নাড়তে পারে। মাদককে 'না' বলা কেবল নিজের জন্য নয়, আমাদের আগামী প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য এক অনিবার্য যুদ্ধ হয়ে ওঠছে।
© Deshchitro 2024