লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে সূর্যমুখী চাষের বাম্পার ফলনে কৃষকদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা। এক সময় যে সব চরাঞ্চল ও অনাবাদি জমি পড়ে থাকত, সেখানে এখন হলুদ সূর্যমুখীর সমারোহ। বাতাসে দোল খাওয়া সূর্যমুখী ফুল যেন উপকূলীয় অঞ্চলের শত শত কৃষকের স্বপ্ন ও আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।


উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সূর্যমুখী চাষ হলেও ১নং উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি সফলতা দেখা গেছে। বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলজুড়ে এখন সূর্যমুখীর ক্ষেত চোখে পড়ার মতো। উর্বর মাটি, অনুকূল আবহাওয়া এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে চলতি মৌসুমে এখানে বাম্পার ফলন হয়েছে।


উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছরের তুলনায় রায়পুরে সূর্যমুখী চাষের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ হেক্টরে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩৫ হেক্টর জমি বেশি সূর্যমুখী চাষের আওতায় এসেছে। ফলে ধান ও অন্যান্য রবি শস্যের পাশাপাশি সূর্যমুখী এখন লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।


সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে হলুদ ফুলের সমারোহ দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কৃষকদের মতে, এবার শুধু জমির পরিমাণই বাড়েনি, গাছের বৃদ্ধি ও ফুলের গঠনও অনেক ভালো হয়েছে।


১নং উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নের পক্ষির চর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক মো. হাবিব উল্লাহ বলেন, কৃষি অফিসের পরামর্শে সূর্যমুখী চাষ শুরু করেছি। আগে এসব জমি খালি পড়ে থাকত, এখন কম খরচে ভালো লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।


কৃষক বেল্লাল হোসেন জানান, এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রতি বিঘায় ৭ থেকে ৮ মণ পর্যন্ত বীজ পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি। বাজারে ভালো দাম পেলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে সূর্যমুখী চাষ করবেন বলে জানান।


রায়পুরে সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণে উপজেলা কৃষি অফিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উন্নত মানের বীজ সরবরাহ, উঠান বৈঠক এবং মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শের কারণে কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে।


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাজেদুল ইসলাম জানান, রায়পুরের মাটি সূর্যমুখী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গত মৌসুমে ৫৫ হেক্টর থেকে এবছর ৯০ হেক্টরে উন্নীত হওয়া একটি বড় অর্জন। কৃষকদের বীজ সরবরাহ থেকে শুরু করে ফসল সংগ্রহ ও তেল আহরণ পর্যন্ত সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে রায়পুরকে সূর্যমুখী উৎপাদনের একটি হাবে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।


পুষ্টিবিদদের মতে, সূর্যমুখী তেলে কোলেস্টেরল কম থাকায় এটি স্বাস্থ্যসম্মত ভোজ্য তেল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়লে দেশের ভোজ্য তেলের আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।


তবে সূর্যমুখী চাষে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আধুনিক মাড়াই যন্ত্রের অভাব এবং বাজারজাতকরণে সীমাবদ্ধতা কৃষকদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের দাবি, সহজ শর্তে ঋণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা হলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।


কৃষিবিদরা মনে করছেন, অনাবাদি জমিগুলো সূর্যমুখী চাষের আওতায় আনা গেলে রায়পুরে কৃষি অর্থনীতিতে নতুন বিপ্লব ঘটবে এবং অঞ্চলটি সূর্যমুখী উৎপাদনের সম্ভাবনাময় এলাকায় পরিণত হবে।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024