|
Date: 2026-03-29 14:11:31 |
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখনো সবুজের ছোঁয়া আছে, কিন্তু সেই সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। মাস খানেক আগেও যে জমিগুলোতে পেঁয়াজ ও রসুনের বাম্পার ফলনের আশা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছিলেন কৃষকরা, আজ সেই জমিই যেন তাদের হতাশার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভালো ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় পেঁয়াজ চাষে লোকসান গুনতে হয়েছে। আর ঈদের পরপর টানা বৃষ্টিতে রসুন ক্ষেত হয়ে উঠেছে নতুন দুশ্চিন্তার কারণ।
শিবচরের অধিকাংশ কৃষকই জমিতে পেঁয়াজ ও রসুন চাষ করেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর ফলন ছিল আশানুরূপ। কিন্তু বাজারে গিয়ে সেই ফসলের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফোটেনি। বরং উৎপাদন খরচই তুলতে না পারায় অনেকেই ঋণের বোঝা বাড়ার শঙ্কায় দিন গুনছেন।
এর মধ্যেই টানা বৃষ্টিতে মাঠে থাকা রসুনে পচন ধরতে শুরু করেছে। সাধারণত রসুন শুকিয়ে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হলেও এবারের আবহাওয়া সেই সুযোগ কেড়ে নিয়েছে। দ্রুত রসুন তুলতে না পারলে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু এখানেই আরেক বাধা—শ্রমিক সংকট।
আগে যেখানে ৫০০–৫৫০ টাকায় শ্রমিক পাওয়া যেত, এখন সেখানে একজন শ্রমিকের জন্য গুনতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ মজুরি। একসঙ্গে সব কৃষক রসুন তুলতে নামায় শ্রমিকের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু সরবরাহ কম। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই জমি থেকে রসুন তুলে সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা যাচ্ছে না। জমিতেই পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান ফসল।
শুধু উৎপাদন নয়, বাজারজাতকরণেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট। তেলের অভাবে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পাইকাররা রসুন কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছে। এতে কৃষকরা আরও বিপাকে পড়েছেন। মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যেন খরচ বাড়ছে, অথচ আয় কমছে।
এই সংকটের মধ্যেও কৃষকরা হাল ছাড়েননি। পেঁয়াজ ও রসুন কাটার পর একই জমিতে পাট চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। নতুন আশায় বুক বেঁধেছেন, হয়তো পাটের ফলন ও দাম ভালো হলে কিছুটা হলেও লোকসান পুষিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু সেখানেও জ্বালানি সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাক্টর চালাতে তেল না পাওয়ায় জমি চাষই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় কৃষক কালাম বেপারীর কণ্ঠে শোনা যায় সেই হতাশার প্রতিধ্বনি—“আগে যে জমি চাষ করতে ২ হাজার টাকা লাগত, এখন ৪ হাজার টাকাতেও পাওয়া যাচ্ছে না ট্রাক্টর।তবুও আশা ছাড়ি নাই, পাটে ভালো কিছু হলে হয়তো টিকে থাকতে পারব।”
পেঁয়াজ ও রসুনের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের সবজি চাষে আগ্রহী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। পাশাপাশি পাটের ভালো দাম পাওয়ার আশা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে কৃষি বিপণন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে তিনি জানান।
শিবচরের মাঠে এখন তাই এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব, একদিকে প্রকৃতির অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে বাজারের নির্মম বাস্তবতা। ঘামে ভেজা মাটিতে ফলন হয়, কিন্তু সেই ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেলে কৃষকের জীবনযুদ্ধ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বৃষ্টি, দাম, শ্রমিক ও জ্বালানি—এই চার দিক থেকে চাপে পড়ে শিবচরের কৃষকরা এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন।
© Deshchitro 2024