|
Date: 2026-02-06 12:08:24 |
লাখো বাংলাদেশি যুবকের স্বপ্নের দেশ ইতালি। উন্নত জীবনের আশায়, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে ও পরিবারকে গর্বিত করতে ইউরোপ পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা করলেও বাস্তবতা তাদের জন্য হয়ে উঠছে নরকীয়। বিশেষ করে লিবিয়ার পথে যাওয়ার সময় অসংখ্য যুবক মানবপাচার চক্রের জালে ফাঁসছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা ও আশেপাশের এলাকাগুলো থেকে গত ছয় মাসে কয়েক শতাধিক যুবক ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তাদের এক বড় অংশ লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর মানবপাচারকারীদের হাতে আটক হন। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অভিযোগ করেছেন, যুবকদের বন্ধ ঘরে আটকে রেখে চালানো হচ্ছে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। পরে মুক্তিপণের নাম করে পরিবারের কাছে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে দেরি হলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়, এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়।
প্রাথমিকভাবে যুবকদের আস্থা অর্জন করে দালালরা তাদের ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। কিন্তু বাস্তবে তাদের হাতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ার অন্ধকার জগতে। অনেক পরিবার সন্তানকে বাঁচাতে নিজের সর্বশেষ সম্বল বিক্রি বা জমি বন্ধক রাখার মতো কঠোর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন। এক ভুক্তভোগীর মা বলেন,
“ছেলেকে ফেরত পেতে যা বলেছে তাই দিয়েছি। এখন আমরা সর্বস্বান্ত। তবুও ছেলেটা বেঁচে আছে কি না জানি না।”
দালালের কাছে থাকা অনেক অভিভাবকও বলছেন, “আমাদের টাকা-পয়সা যা গেছে, যাক; এখন আমাদের সন্তান আমাদের বুকে ফিরিয়ে দিক। ওদের ঠিক মত খাবার দিচ্ছে না, অসুস্থ হলে ঔষধও দেয় না ঐ অমানুষের দল।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, মানবপাচার চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় সক্রিয়। পাচারের অর্থের একটি অংশ তাদের কাছেও পৌঁছে বলে মনে করেন অনেকে। ফলে দালাল ও মধ্যস্থতাকারীরা বছরের পর বছর ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিবচর উপজেলায় এখনও বেশ কয়েকজন যুবক নিখোঁজ থাকলেও কোন পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি। ভয়, সামাজিক চাপ এবং সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে তারা মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছেন, মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধ দমন করতে জনসচেতনতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রশাসনের দৃঢ়, জোরালো ও দৃশ্যমান ভূমিকা। দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকবে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন—লিবিয়ায় জিম্মি থাকা বাংলাদেশি যুবকদের মুক্তির দায়িত্ব কার? অভিযোগ না থাকলে কি প্রশাসনের দায় শেষ হয়ে যায়? মানবপাচার চক্রের মাধ্যমে আর কত পরিবার নিঃস্ব হবে, কত মা হারাবেন সন্তান, কত স্ত্রী হারাবেন স্বামী?
এখনও এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর অজানা। তবে একথা স্পষ্ট—নীরবতা মানবপাচারকারীদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
© Deshchitro 2024