জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিতসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির  রূপান্তরে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে টিআইবির সুপারিশসমূহ প্রস্তাব


মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ইন্টারন্যাশনাল ক্লিন এনার্জি দিবস ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-টিআইবি শ্রীমঙ্গলের আয়োজনে সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সকালে শহরের মৌলভীবাজার সড়কে বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা সনাক সভাপতি অ্যাডভোকেট আলাউদ্দিন আহমেদ

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) শ্রীমঙ্গল-টিআইবির এরিয়া কোঅর্ডিনেটর-সিই মো: আবু বকর এর সঞ্চালনায় মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন সনাক সহ-সভাপতি এস.এ হামিদ, সদস্য দ্বীপেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য্য, পরিমল সিং বাড়াইক, রীনা মজুমদার, ইয়েস ও এসিজি সদস্যবৃন্দ এবং ছাত্র-জনতাসহ প্রায় শতাধিক মানুষ। 

সভাপতির বক্তব্যে উপজেলা সনাক সভাপতি অ্যাডভোকেট আলাউদ্দিন আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেও দেশ এখনও আমদানী নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লেও, বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্লাবানির অংশ মাত্র ৪.৬ শতাংশ। ২০১০-২০২৩ সময়কালে বাংলাদেশের  জ্বালানি  খাতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমান বিদেশি বিনিয়োগ হলেও এর ৯৬.৭ শতাংশ জীবাশ্ম জ¦ালানিভিত্তিক প্রকল্পে এবং মাত্র ৩.৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য  জ্বালানির  খাতে বিনিয়োগ হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য  জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়নে অসঙ্গতি ও অস্পষ্টতা এবং বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। তিনি আরো বলেন, বিদ্যুৎ ও  জ্বালানির  মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অগ্রাধিকার খাতে একদিকে নবায়নযোগ্য  জ্বালানির  থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সংক্রান্ত নীতি, পরিকল্পনা ও আইনের যেমন কিছু ঘাটতি রয়েছে; অন্যদিকে, বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার সীমাবদ্ধতা ও অস্পষ্টতা কাজে লাগিয়ে প্রকল্প অনুমোদন, বাস্তবায়ন ও নীতিনির্ধারণে অনিয়ম ও সমন্বয়হীনতার চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনের সক্ষমতা, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ, প্রণোদনা, অবকাঠামোগত সুবিধাসহ আমলাতান্ত্রিক সহায়তা ও দেশি-বিদেশি লবির প্রভাব নবায়নযোগ্য  জ্বালানির পরিরর্তে জীবাশ্ম  জ্বালানিকে  অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। সার্বিকভাবে, এ খাতে নীতি করায়ত্ত, স্বার্থের দ্বন্ধ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতিসহ সুশাসনের ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করে। 

বক্তারা জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিতসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তরে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান। মানববন্ধনে জ¦ালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিতসহ নবায়নযোগ্য  জ্বালানির  রূপান্তরে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে টিআইবি সংশ্লিষ্ট অংশীজনের বিবেচনার জন্য ৯টি সুপারিশসমমুহের প্রস্তাব তুলে ধরে।

টিআইবির সুপারিশ :

এ দিবসটি উপলক্ষ্যে  জ্বালানি  খাতে সুশাসন নিশ্চিতসহ নবায়নযোগ্য  জ্বালানির  রূপান্তরে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে টিআইবি সংশ্লিষ্ট অংশীজনের বিবেচনার জন্য নিম্নলিখিত সুপারিশসমূহ প্রস্তাব করছে-

১) রাজনৈতিক দলসমূহকে জীবাশ্ম  জ্বালানির  ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বন্ধ করা এবং  জ্বালানি মিশ্রণে নবানয়নযোগ্য  জ্বালানির  পরিমাণ বৃদ্ধির অঙ্গীকার করতে হবে; যার মধ্যে থাকবে-জীবাশ্ম  জ্বালানিনির্ভরতা থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ¦ালানিকে অগ্রাধিকার প্রদান করা এবং খসড়া ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান (ইপিএসএমপি) ২০২৫’ চুড়ান্তকরণের পূর্বে নাগরিক সমাজ, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজিয়ে চুড়ান্ত করা; ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য  জ্বালানিতে  রূপান্তরসহ ‘নেট-জিরো’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে  জ্বালানি  খাতে নীতি করায়ত্ত বন্ধ এবং স্বার্থের দ্ব›দ্ব প্রতিরোধসহ এখাত সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করা; আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও নবায়নযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জীবাশ্ম  জ্বালানি  নির্ভর প্রকল্পে অর্থায়ন ও এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে কমানোর জন্য সময়াবদ্ধ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা; নবায়নযোগ্য  জ্বালানিতে  রূপান্তর-সংক্রান্ত কার্যক্রমে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য টেকসই ও নবায়নযোগ্য  জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (¯্রডো) কে একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা প্রদানসহ এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা;  নবায়নযোগ্য জ¦ালানি প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য তহবিল বরাদ্দ এবং গবেষণা ও শিল্পখাতের মধ্যে সহযোগিতা নিশ্চিত করা; এবং

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।

২) নবায়নযোগ্য  জ্বালানি  নীতি ২০২৫সহ বিদ্যমান সকল নীতি ও পরিকল্পনায় অভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। 

৩) নবায়নযোগ্য  জ্বালানি  খাতের প্রসারে নীতিগত অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার জন্য এর উৎপাদন ও সরবরাহ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ একটি উপযুক্ত বিনিয়োগ কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। 

৪)  জ্বালানির  এবং বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র প্রদান এবং দূষণ ও পরিবেশ-বিষয়ক তদারকিতে স্বচ্ছ ও যথাযথ-প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।


৫) আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক এবং দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত  জ্বালানি  খাতের সকল প্রকল্প প্রস্তাব এবং চুক্তির নথি প্রকাশ করতে হবে। 

৬) এনডিসি’র অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে বাতিল হওয়া কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমিতে সোলারসহ নাবায়নযোগ্য  জ্বালানির  প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। 

৭) শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদের নেট মিটারিং সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন সহজীকরণ, ফিড-ইন-ট্যারিফ কার্যকর এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রণোদনা প্রদান করতে হবে।

 ৮) নবায়নযোগ্য  জ্বালানির  উৎপাদনকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে; স্বার্থের দ্বদ্ধমুক্ত থেকে প্রকল্প অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। 

৯) বিদ্যুৎ ও  জ্বালানি  খাতের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে সুশাসন ঘাটতি ও দুর্নীতি ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকল্প অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, চুক্তির শর্ত নির্ধারণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024