যশোর জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের পুরনো ভবনে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই শ বছরেরও বেশি সময়ের অমূল্য ও ঐতিহাসিক দলিলপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) রাত ৯টার দিকে এই রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ব্রিটিশ আমল থেকে সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমি সংক্রান্ত ভলিউম বুক, বালাম বই, সূচিপত্র ও টিপ বইসহ অসংখ্য নথি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।ভবনটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা এবং ঘটনার সময় পাহারাদারের অনুপস্থিতি অগ্নিকাণ্ডটিকে ‘পরিকল্পিত নাশকতা’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে হঠাৎ করে রেজিস্ট্রি অফিসের পুরনো ভবনের ভেতর থেকে ধোঁয়া ও আগুনের শিখা দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে যশোর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দুটি ইউনিট রাত সোয়া ৯টায় ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে কক্ষের ভেতরে থাকা আলমারি ও তাকে সাজানো শত বছরের পুরনো রেকর্ড রুমের অধিকাংশ নথি পুড়ে যায়।যশোর ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার ফিরোজ আহমেদ জানান, "আমরা যখন আসি, তখন ভবনের প্রধান ফটকে তালা দেওয়া ছিল। ভেতরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। পরে তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আমরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনি।শার্শা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের মোহরার শামসুজ্জামান মিলন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই পুরনো ভবনটিতে ১৭৪১ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত সময়ের সংরক্ষিত দলিলপত্র ছিল। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে এই অঞ্চলের ভূমি মালিকানার যাবতীয় আদি রেকর্ড এখানে সংরক্ষিত থাকত। অগ্নিকাণ্ডে দুই শ বছরের পুরনো এই বালাম বই ও সূচিপত্র পুড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ভূমি মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা চরমে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অবশিষ্ট কিছু নথি আগুন নেভানোর পানির তোড়ে ভিজে অকেজো হয়ে গেছে।

অগ্নিকাণ্ডের ধরণ নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এটি সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা নয়। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হচ্ছে:ভবনটিতে কোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ নেই, ফলে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগার কোনো সুযোগ নেই।ভবনটি পাহারার দায়িত্বে হীরা নামে একজন নৈশপ্রহরী থাকার কথা থাকলেও ঘটনার সময় তাকে পাওয়া যায়নি।গুরুত্বপূর্ণ দলিল ধ্বংসের মাধ্যমে কোনো বিশেষ চক্র লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।যশোর দলিল লেখক সমিতির সভাপতি সোহরাব হোসেন বলেন, "রাত ৯টার পর আগুন লাগার খবর পাই। গিয়ে দেখি গেট তালাবদ্ধ, অথচ ভেতরে আগুন। গার্ডের কোনো হদিস নেই। এটা নিশ্চিতভাবেই কোনো চক্রান্ত হতে পারে।ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও আগুনের সঠিক কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। তবে তালাবদ্ধ বিদ্যুৎহীন ভবনে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হলো, তা খতিয়ে দেখছে প্রশাসন।যশোরের সচেতন মহলের দাবি, একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এই নথিপত্র ধ্বংসের পেছনের কুশীলবদের খুঁজে বের করতে হবে এবং ভূমি মালিকানায় সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে দ্রুত বিকল্প পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024