দীর্ঘ ১৩ বছরের আইনি লড়াই, একাধিক আদালতের রায় ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অবশেষে নিজেদের অর্পিত সম্পত্তির জমি বুঝে পেলেন সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের খুটিকাটা গ্রামের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুই সদস্য রবি শংকর মন্ডল ও অভিজিৎ মন্ডল। রবিবার (২১ ডিসেম্বর) স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আলোকে তাদের হাতে জমির শান্তিপূর্ণ দখল হস্তান্তর করা হয়।

জানা গেছে, গড়কুমারপুর মৌজার এসএ ১৯১ থেকে ১৯৫ নম্বর দাগভুক্ত জমিগুলো তাদের পূর্বপুরুষ নরেন্দ্রনাথ মন্ডলের মালিকানাধীন ছিল। ভুলবশত একসময় সরকারি নথিতে জমিগুলো ‘এনিমি প্রোপার্টি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। পরবর্তীতে প্রকৃত মালিকদের কাছে অর্পিত সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার ২০০১ সালে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন প্রণয়ন করে।

এই আইনের আওতায় রবি শংকর মন্ডল ও অভিজিৎ মন্ডল ২০১২ সালে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনাল, সাতক্ষীরা (যুগ্ম জেলা জজ আদালত)-এ মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ৬১৭/১২। দীর্ঘ ছয় বছর বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১৮ সালের ২৯ নভেম্বর যুগ্ম জেলা জজ আদালত তাদের পক্ষে রায় ও ডিক্রি প্রদান করেন।

এরপর সরকার পক্ষ ২০১৯ সালে অতিরিক্ত জেলা জজ, ২য় আদালত, সাতক্ষীরায় আপিল মামলা (নং-১৩/১৯) দায়ের করে। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২২ সালের ২২ মে আপিল আদালতও আগের রায় বহাল রাখেন এবং ৯০ কর্মদিবসের মধ্যে রায় বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন।

রায়ের ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের ২৫ জুলাই সরকারি ভিপি কৌশলী নাজমুন নাহার (ঝুমুর) স্বাক্ষরিত পত্রে জানানো হয় যে, রায় বাস্তবায়নে কোনো আইনগত বাধা নেই। একই বছরের ১৬ নভেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জমি অবমুক্ত করে শ্যামনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে নামজারি সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান সংশোধিত খতিয়ান অনুযায়ী মোট ৪.৭১ শতক জমি রবি শংকর মন্ডল ও অভিজিৎ মন্ডলের নামে নামজারি করেন। এরপর থেকে তারা নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে আসছিলেন।

২০২৩ সালের ২৩ মার্চ জমির দখল বুঝে পেতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন রবি শংকর মন্ডল। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সরকারি আমিন দিয়ে জমি মাপজোক করে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে জমির দখল হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে একই গ্রামের মোঃ ইসহাক আলী মোড়ল মালিকানা না থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। তবে ২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি আদালত মামলাটি ভিত্তিহীন উল্লেখ করে খারিজ করে দেন। পরে সামাজিক সমাধানের লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদুল ইসলামের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে আদালতের রায় ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করে তিনিও জমিটির প্রকৃত মালিক হিসেবে রবি শংকর ও অভিজিৎ মন্ডলের নাম নিশ্চিত করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তারা নানাভাবে হয়রানি ও বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। তবে সকল আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় এবং প্রশাসনের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত তারা ন্যায়বিচার পেয়েছেন।

এ বিষয়ে পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমজাদুল ইসলাম বলেন, ইসহাক আলীর পক্ষে জমির মালিকানা প্রমাণের মতো কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। আদালতের রায় অনুযায়ী জমির প্রকৃত মালিক রবি শংকর মন্ডল ও অভিজিৎ মন্ডল।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024