স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি আজ উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপে দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার পর থেকে কৃষি, শিল্প, রপ্তানি, সেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে দেশ। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামো উন্নয়ন ও মানবসম্পদ বিকাশের মতো সূচকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে আমরা উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছি। তবে এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করা এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের জন্য সবচেয়ে অপরিহার্য হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার জন্য এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য। সাধারণত বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিকল্প নেই। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা শুধু সরকার পরিবর্তন বা নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হওয়া নয় বরং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে নীতির ধারাবাহিকতা, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পান। নতুন নতুন শিল্প গড়ে ওঠে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে দেশে আসেন। অপরদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল দেশকে বেছে নেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে তারা ঝুঁকি নিতে চান না। যেমন, শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণেই বাংলাদেশ পোষাক শিল্পে বিশ্বের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো এবং বর্তমানে পোষাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ২য়। সুতরাং স্থিতিশীল পরিবেশেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে। অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়।

তবে দু:খের বিষয় যে বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা বহুবার অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। হরতাল, অবরোধ ও সহিংস আন্দোলনের কারণে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে এবং পরিবহন ব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হওয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে ক্ষতি হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও রাজনৈতিক অশান্তির কারণে বিনিয়োগে অনীহা প্রকাশ করেছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া কোটা আন্দোলন ও সরকার পতনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কিছুটা বেড়েছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের এক বছর পূর্ণ হলেও চলমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যায়নি। ফলে এর প্রভাব পড়েছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে অনাগ্রহ। অর্থনৈতিক এই চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া, দেশীয় কারখানা গুলোর অচলাবস্থা এবং রপ্তানি হার কমে যাওয়া। 

বাংলাদেশের রিজার্ভ অস্বস্তিজনক অবস্থায় থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিম্নমুখী অবস্থা উদ্বেগজনক। দীর্ঘ ১৫ বছরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের হতাশাজনক অবস্থার কারণে বেশ চাপে রয়েছে বাংলাদেশ। তাই ২৪ পরবর্তী বাংলাদেশে এসকল বিষয় গুরুত সহকারে দেখতে হবে এবং কাজ করতে হবে। সমৃদ্ধি লাভের জন্য তাই রাজনৈতিক অবস্থার ও পরিবর্তন করতে হবে৷ 

তবে শুধু রাজনৈতিক শান্তি থাকলেই যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন কার্যকর সুশাসন ও আইনের শাসন। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং স্বচ্ছতার অভাব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নীতি-নির্ধারণে জবাবদিহিতা থাকা জরুরি। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয় ই পারবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে৷ কেননা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অনেক সুযোগ রয়েছে। তবে যেকোন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়া অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যার অন্যতম একটি বিষয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশকে তাই নিশ্চিত করতে হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ হলেও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাচ্ছে বাংলাদেযহ। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতায় রূপ দিতে হলে সবচেয়ে জরুরি শর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ অচিরেই দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের পথে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তাই অপরিহার্য ভিত্তি।


প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024