বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলা শাখার কারণদর্শানো একটি নোটিশের লেখাতে অন্তত ২৬ জায়গায় ভুল হয়েছে। শব্দের বানান, শব্দ চয়ন, বাক্য গঠন, অপ্রয়োজনীয় শব্দ এবং বিরামচিহ্নের ব্যবহারসহ অর্থ প্রকাশে এসব ভুল দৃষ্টিগোচর হয়। মাত্র একটি নোটিশের লেখায় অতগুলো ভুলের কারণে বিষয়টি দৃষ্টিকটু ঠেকেছে অনেকের কাছে। এনিয়ে তুমুল সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে সচেতন মহলে। 

গতকাল মঙ্গলবার (২৬ আগষ্ট) দিবাগত রাতে উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মো. ফিরোজ আহমেদ মিন্টুর স্বাক্ষরিত চিনাডুলী ইউনিয়নের উত্তর শাখা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ছাইফুল ইসলামকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে দলীয় প্যাডে দেওয়া কারণদর্শানোর নোটিশে এসব ভুল দেখা গেছে। তবে নোটিশে লেখাতে কোনো ধরনের ভুল করা হয়নি মর্মে দাবি করেন তিনি। ওই রাতে উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মো. ফিরোজ আহমেদ মিন্টু তাঁর ফেসবুকে পোষ্ট করায় মুহূর্তে মধ্যেই নোটিশটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভুল বানানে ভরা নোটিশ দেখে নেটিজেনরাসহ শিক্ষার্থীরা ভুল বানান শিখছে বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন মহল। মনোবিদেরা বলছেন, এ ধরনের ভুল বানান শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। বানান ভুল ও ভাষা বিকৃতির বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতাকে দায়ী করে অনেকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলেছেন। নোটিশটি ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রথমে ’বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ স্থলে ভুলভাবে লেখা হয় ’বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি।’ এরপর ’সূত্র নং’ বাক্য লেখা থাকলেও কোনো ধরনের সূত্র উল্লেখ করা হয়নি। ’তারিখ’ শব্দের পর অতিরিক্ত বিসর্গ বর্ণের ব্যবহার করা হয়েছে। ’তারিখ : ২৬.০৮.২০২৫ খ্রিস্টাব্দে’ বাক্যের স্থলে ভুলভাবে লেখা হয়েছে ’তারিখঃ ২৬/০৮/২০২৫ ইং’। নামের আগে ’মোহাম্মদ’ শব্দের সংক্ষিপ্তকরণে ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ’বিসর্গ’ বর্ণের। 

এ ছাড়া ’সাধারণ সম্পাদক’ বাক্যের স্থলে ’সাধারন সম্পাদক’, ’৩ নম্বর চিনাডুলী ইউনিয়ন উত্তর শাখা বিএনপি’ বাক্য লেখার পরিবর্তে ’০৩ নং চিনাডুলী ইউনিয়ন উত্তর শাখা ইসলামপুর, জামালপুর।’ লেখা হয়েছে। ফলে ওই বাক্যটির কোনো অর্থ প্রকাশ হয়নি। ’বিষয়’ শব্দের পরে যতিহিহ্ন কোলনের স্থলেও ’বিসর্গ’ বর্ণের ব্যবহার করা হয়। ’কারণদর্শানোর নোটিশ প্রসঙ্গে’ বাক্যটিও বানানসহ শব্দ গঠনে ভুল হয়েছে। 

নোটিশটির মধ্যভাগে ’নিয়মবহির্ভূত’ শব্দ না লিখে ভুলভাবে লেখা হয়েছে ’নিয়ম বহির্ভূত’। ’কার্যক্রম পরিচালনা করছেন মর্মে’ বাক্যের স্থলে লেখা হয়েছে ’কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে’। সংগঠনবিরোধী, কর্মকাণ্ড, এবং হল শব্দের বানানেও করা হয়েছে ভুল। 

এবিষয়ে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মো. ফিরোজ আহমেদ মিন্টু আজকের পত্রিকাকে বলেন, ’নোটিশের লেখাতে কোনো ধরনের ভুল করা হয়নি। বরং শুদ্ধ ভাষারীতিতেই নোটিশ লেখা হয়েছে।’ এমন প্রশ্নের জবাবে নোটিশটি কী পড়েছে কি না, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ’হ্যাঁ। আমি নোটিশ পড়েছি। লেখা ঠিক আছে।’ পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে বিএনপি নেতা ফিরোজ আহমেদ মিন্টু আরও বলেন, ’আপনি এখনও বানান ভুল ধরেন? এখন তো ব্যাকরণ অনুযায়ী বড় শব্দ ছাড়া বানান ভুল হয় না? লিখলেই হল। কোনো সমস্যা নেই।’ 

উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নবাব বলেন, ’দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে দুইজন নেতাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ভুল বাক্যে নোটিশের লেখা হয়েছে কি না, সেটা নোটিশ পড়ার পর জানতে পারব। তবে ভবিষ্যতে যাতে বানানসহ ভুল বাক্যে দলীয় নোটিশের না লেখা হয়, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।’

শিশু ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হেফজুল বারী বলেন, বিশেষ করে স্কুল-কলেজে পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক কিছুই দেখে শেখে। ভুল বানানের ঘেরাটোপ থেকে অনেকেই বেরিয়ে আসতে পারে না। সেকারণেই আমাদের শুদ্ধ ভাষার চর্চা করাটা জরুরি।’

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী মুহাম্মদ মানিক মিয়া বলেন, ‘বিকৃত বানান ও ব্যাকরণগত ভুলের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যত্রতত্র বাংলা বানানের ভুল, ভাষার জন্য অমর্যাদাকর। এ ধরনের ভুল ও বিকৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগী হওয়া দরকার।’ 

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024