আজ সকালেও ঠিক ৬:০০টায় ঘুম ভেঙে গেলো।বাইরে তাকিয়ে দেখি মেঘে অন্ধকার হয়ে আছে চারিদিক।বিছানায় থাকতে ইচ্ছে করলো না, বারান্দার ভারি পর্দা সরিয়ে দিলাম, মুহুর্তেই যেন পুরোটা আকাশ আমার ঘরের ভেতর আছড়ে পড়লো।কফি মেশিনে কফি বসিয়ে জামেনা কে ডেকে উঠালাম, একটু বোধহয় বিরক্ত ই হলো।
বললো, " ছুটির দিনেও আপনার ছুটি নাই?" হেসে ফেললাম,আমার ঘরে আমার না থাকা জুড়ে পুরো টা ঘর সংসার জুড়ে থাকে এই মেয়েটি,আমার বাইরের পরিশ্রম কে সহজ করে দেয় ঘরের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে, সবটুকু যত্ন, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখে আমার মেয়ে কে।বারান্দায় এসে দাঁড়ালা্ম, শহর টা এখনো পুরোপুরি জাগেনি, এর ই মাঝে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ মনে হলো অনেক দিন দোলনচাঁপা কেনা হয়না, তার পর মনে হলো, অনেক দিন অনেক কিছুই করা হয়ে উঠে না।আমার রান্না ঘরে যাওয়ার সুযোগ ইদানিং হয়না বললেই চলে, নামায পড়ে চুলায় খিচুড়ি বসিয়ে দিলাম,কন্যার বাবার পছন্দের খাবার।
আব্বু ও পছন্দ করতেন খুব।গরম পাতলা খিচুড়ি আর সরিষার তেল।খিচুড়ি টা মাখাতেন এতো মজা করে,আমি এগিয়ে গিয়ে বলতাম "মুখে দাও"। প্রতিটা সকালের একটা গন্ধ থাকে। আব্বু'র সাথে শুক্রবারের সকাল গুলোর গন্ধ ছিলো অন্যরকম - জীবনের ঘ্রাণ এ ভরপুর!
রাতে বন্ধ করা মুঠোফোন চালু করতেই টুংটাং শব্দে একের পর এক মেসেজ এবং মিসড কলের নোটিফিকেশন আসতে থাকলো।এক শুভাকাঙ্ক্ষীর মেসেজে চোখ আটকালো।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসের ১ তারিখ, সারাটা দেশ যখন উত্তাল, আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম সহ আমাদের ভাই -বোন, সন্তানদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে ,সেই রাতে চ্যানেল ২৪ এ করা টকশো'র একটা ক্লিপ পাঠিয়ে তিনি মন্তব্য করেছেন,
" এই টকশো থেকে আপনাকে বাসায় ফিরতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত হলে আমি যখন আপনাকে জানালাম, আপনার সেদিনের নির্ভীক কন্ঠস্বর আমার আজ ও কানে বাজে, কৃতজ্ঞতা!"
খুব সংগত কারনেই তাঁর পরিচয় প্রকাশ করছিনা। তবে আজ এই বৃষ্টি ভেজা সকাল তিনি যেই সময়ে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন, তার জন্য উনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা অপরিসীম!
সেদিন টকশো'র এক পর্যায়ে আমি তৎকালীন অবৈধ প্রধানমন্ত্রী কে "So called Prime Minister" বলে সম্বোধন করাতে আমার সহ আলোচক এবং টক শো' উপস্থাপক দু'জনেই বেশ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন অন স্ক্রিনে। উপস্থাপক শুরুতে বিষয় টা ইগনোর করে গেলেও সম্ভবত তাঁর কানে লাগানো ইয়ার ফোনের ওপাশ থেকে কারো দ্বারা আদিষ্ট হয়ে ২/৩ সেকেন্ড এর মধ্যেই তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, "আপনি কি সো কলড প্রধানমন্ত্রী বললেন?" আমার স্পষ্ট জবাব, জ্বি আমি সেটাই বলেছি। সেই উত্তরের পর পরিবেশ টা অন্য রকম হয়ে যায়।টক শো চলাকালীন সময়েই আমার মোবাইলে একের পর এক মেসেজ আসতে থাকে, বাসা থেকে মা অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে কল করতে থাকেন।শো শেষ হতেই মা'র কল রিসিভ করলাম। তিনি বললেন এখুনি অন্য কোথাও চলে যাও, বাসায় আসবেনা।তখন বাজে রাত ১:০০টা। আমি ঠাট্টা করে বললাম, এতো রাতে মা হয়ে তুমি ঘরে উঠতে নিষেধ করছো, অন্য কে ঘরে জায়গা দেবে? তিনি অবশ্য ঠাট্টার ধার ধারলেন না,তাঁর একটাই কথা বাসায় এলেই তোমাকে ওরা উঠিয়ে নিয়ে যাবে। ঠিক সে সময় শুভাকাঙ্ক্ষী এই ভাইটি আমাকে কল করে সেই মুহূর্তে স্টুডিও থেকে সরে পড়তে বললেন।চ্যানেল আমাকে গাড়ি অফার করে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিতে চাইলো। আমি অবশ্য আমার নিজের পঙ্খিরাজে করে সোজা বাসাতেই ফিরেছিলাম,মা কে না জানিয়ে।
আমরা এই সব মুহূর্ত গুলো কি বেমালুম ভুলতে বসেছি!গত বছর ঠিক এই দিনে কি ঘটে চলেছিলো সারাটা দেশ জুড়ে, 'জুলাই ২৪' - ইতিহাস রচিত হওয়ার জন্য প্রতিদিন হাজার টা করে লাইন লেখা হচ্ছিলো রক্তের দাগে, দাউ দাউ করে জ্বলে উঠা দ্রোহের অক্ষরে! কি নিদারুন বুক ফাটা আর্তনাদে আকাশ ভারি হয়ে উঠেছিলো প্রতিটি মুহুর্তে...!
কফির গন্ধে বর্তমানে ফিরে এলাম। প্রতিদিন সকালে আমার নিজস্ব একান্ত কিছুটা সময় কাটে এক মগ কফির সাথে। আজ আগস্ট মাসের ১ তারিখ। আগস্ট' ২৪ থেকে আগস্ট' ২৫ - এক বছরের ব্যবধানে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে কতটা শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছি সেই প্রশ্ন আজ নিজেরা নিজেদের করাটা খুব জরুরী।৭১ কে ধারন না করে চেতনার দাঁড়িপাল্লায় একটা গোষ্ঠীকে বেঁচতে দেখেছি বহু যুগ, একই ভাবে জুলাই' ২৪ কে নিয়ে পসরা সাজিয়ে হাটে বাজারে তোলা হচ্ছে খুব জোরেসোরেই, প্রতিদিন ই এগুলো বেড়িয়ে আসছে স্বরূপে।মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করার এটাই সময়, এবং প্রশ্নটা আগে করতে হবে নিজের দিকে আঙুল উঁচিয়ে! ধারণ করতে পারলে বহুদূর এগিয়ে যাওয়া যায়, তা সেই ধারণ করাটা চেতনার, বোধের, ভালোবাসার, ঘৃনার যে কোন অনুভূতির ই হোক না কেন। আমরা জুলাই- আগষ্ট' ২০২৪ কে যদি own করতে না পারি, ধারণ করতে না পারি, কেবল পসরা নিয়ে 'জুলাই লাগবে জুলাই' বলে একাত্তর এর মত বিক্রির পাঁয়তারা ভাজতে থাকি তাহলে সেই কথার ই পুনরাবৃত্তি করে বলতে হয়, ইতিহাস স্বাক্ষী- ইতিহাস থেকে শেখা হয়না। ১৯৭১ আমাদের দিয়েছে স্বাধীনতা, ২০২৪ দিয়েছে সেই স্বাধীনতা দেশের প্রতিটি জনগন যেন নিজের বলে দাবী করতে পারে, দেশের নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বলতে পারে সবার আগে আমার বাংলাদেশ, সেই প্রত্যয় - আমাদের কি মনে হয় না, মুখোমুখি দাঁড়াবার এই তো সময়?