সাতক্ষীরা শহরের প্রাণসায়ের খালের দুই পাশ এবং মধ্য কাটিয়ায় গড়ে উঠেছে শতাধিক পুরাতন মোটরসাইকেল কেনাবেচার শোরুম। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এখানে শুধু যানবাহনের ক্রয়-বিক্রয় হয়। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ শোরুমে চলছে সুদের কারবার। নামমাত্র ট্রেড লাইসেন্সে চালু এসব শোরুমগুলো সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চলছে বছরের পর বছর। ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দিয়ে সরকারকে বঞ্চিত করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে।


এই পুরাতন মোটরসাইকেল হাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সুদভিত্তিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অধিকাংশ শোরুমে এখন আর মূল ব্যবসা মোটরসাইকেল বিক্রি নয়—বাড়তি চড়াসুদের টাকার লেনদেনই মুখ্য হয়ে উঠেছে। জরুরি প্রয়োজনে টাকা দরকার হলে, সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে নিজের মোটরসাইকেল বন্ধক রেখে চড়াসুদে টাকা নেয়। পরে সেই চড়া সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক মোটরসাইকেল ও কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়।


গাড়ি ছিনিয়ে নিতে ব্যবহার করা হয় লোকাল ছিনতাইকারী, মাদকাসক্ত ভাড়াটিয়া মাস্তানদের। শুধু সুদ নয়, এসব শোরুমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রির একটি সংগঠিত সিন্ডিকেট। সাতক্ষীরা জেলার এই চক্রটি যশোর, খুলনা, মাগুরা ও ঝিনাইদহসহ আশপাশের জেলা থেকে মোটরসাইকেল চুরি করে এনে স্থানীয় শোরুমে বিক্রি করে। পরবর্তীতে এসব চোরাই মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ খুলে লোকাল মার্কেটে বিক্রি করা হয়।


ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) এক অভিযানে অতীতে এসব চোরাই মোটরসাইকেল সিন্ডিকেটের সদস্যদের আটক করা হয় এবং তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে সাতক্ষীরার বেশ কিছু শোরুমে অভিযান চালিয়ে শতাধিক চোরাই মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়।


সম্প্রতি ‘ভাই ভাই মোটরস’ নামে একটি শোরুমে চড়া সুদের ফাঁদে ফেলে এক সাংবাদিকের মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। জানা যায়, চেক সই করিয়ে ও ভাড়াটিয়া মাস্তান দিয়ে তাকে শোরুমে তুলে নিয়ে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে ওই সাংবাদিককে উদ্ধার করে।


ভুক্তভোগী প্রনব নামের এক ব্যক্তি জানান, ৭-৮ মাস আগে ‘ভাই ভাই মোটরস’ শোরুমে ৩০ হাজার টাকায় নিজের মোটরসাইকেল বন্ধক রাখেন। পরে ১০ হাজার টাকা সুদসহ পরিশোধ করলেও শোরুম কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা দাবি করে এবং দুটি চেক সই করিয়ে নেয়। এখন তাকে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে।


অন্যদিকে, আশাশুনির আরেক ভুক্তভোগী জানান, তিনি মাত্র ২ মাস ১ দিন পর সুদ পরিশোধে গেলে তার কাছ থেকে ৩ মাসের সুদ দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে আটকিয়ে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে মোটরসাইকেল উদ্ধার করেন। তিনি বলেন, “এই চড়া সুদের ফাঁদে পড়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে শোরুমে মোটরসাইকেল ফেলে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।”


সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্সের সদস্য সুমন খান বলেন, “পুরাতন মোটরসাইকেল শোরুমের আড়ালে চড়া সুদের ব্যবসা চলে—এটা সত্য। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”


এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শামিনুল হক বলেন, “আমরা এমন অভিযোগ পেয়েছি। ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করেছে। চড়া সুদের কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আইনের আওতায় আনা হবে।”


প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024