/ সম্পাদকীয় ও কলাম

জীবন খেলায় টাকাই কি সব?

জসিম উদ্দিন - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

আপডেট: 29-04-2021 16:30:32

আমাদের সমাজে একটা প্রচলিত কথা আছে 'Money is the second god of this world' মানে টাকাকে দ্বিতীয় ঈশ্বর বলে দাবি করা হচ্ছে।বলা হচ্ছে এ পৃথিবীতে টাকাই সব।টাকা থাকলে সব হয়।


সব করা যায়, সব পাওয়া যায়।ক্ষমতা, ফুর্তি, বিলাসিতা, আরাম-আয়েশ, প্রেম-ভালোবাসা, কালোকে সাদা বানানো, আইন পকেটে নিয়ে ঘুরা, যশ, খ্যাতি; সবকিছু মিলে।বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক স্যার টমাস ব্রাউন বলে, "অর্থ যেখানে নাই ভালোবাসা সেখানে দুর্লভ।" সক্রেটিস বলে ”যার টাকা আছে তার কাছে আইন খোলা আকাশের মতো, আর যার টাকা নেই তার কাছে আইন মাকড়সার জালের মতো।” বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও একদা উপলব্ধি করছেন যে, টাকাই সব।কিন্তু এ ধারণার সত্যতা কতটুকু? সত্যি টাকাই কি সব? চলুন সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার নিরিখে ধারণাটি আলোকপাত করি।

 

আমি মনে করি এই পুঁজিবাদী সমাজে টাকার দরকার আছে।তবে টাকা না থাকলেই যে আপনি/আমি এ সমাজে কেউ না বা টাকা থাকলেই যে আপনি/আমি এ সমাজের সব; সে অর্থে না বরং মানুষ জাতির জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে হলে টাকা বেশ দরকার।কিন্তু টাকা থাকলে সব পাওয়া যায় বা হওয়া যায়; সে ধারণাটি একেবারে না ফেলে দেওয়ার মতো, না একেবারে ধরে রাখার মতো।আমি এমন মত পোষণ করলাম কেন তা আগে বলে নেই।দেখুন সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া তিনটি ঘটনা...

 

এক. ষাটের দশকে দর্শক মাতানো ও চলচ্চিত্রের 'মিষ্টি মেয়ে' চিত্রনায়িকা কবরীর মৃত্যু, ১৭ এপ্রিল ২০২১। দুই. কূটনীতিক জ্ঞান সম্পর্কিত অনেক বই জাতিকে উপহার দেওয়ার জ্ঞানদ্যুতি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের মৃত্যু, ১৭ এপ্রিল ২০২১। তিন. গুলশান-২ এর একটি ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান(মুনিয়া) নামের এক তরুণীর মৃত লাশ উদ্ধার, ২৬ এপ্রিল ২০২১।তরুণীর পরিবারের দাবী এ আত্মহত্যা নয় বরং ষড়যন্ত্রমূলক হত্যা।ফলে থানায় মামলা, আসামি বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীর।

 

দেখুন এই তিনটি ঘটনা টাকা প্রসঙ্গে আমাদেরকে কি মেসেজ দিয়ে যাচ্ছে ।এখানে কার কাছে টাকা বা অর্থের গুরুত্ব কেমন, কেন বা কেন নয়?

 

প্রথমত বলি চিত্রনায়কা কবরীর কথা।উনি সম্প্রতি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন।ফলে উনার মৃত্যুতে ভক্তদের শোকের বার্তায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ তোলপাড়।ভাইরাল হয় ২০১৯ সালে কবরীর দেওয়া প্রথম আলোর একটি সাক্ষাৎকার যে "আমার একটা দুঃখ রয়ে গেল, জীবনে আমি একজন ভালো বন্ধু পেলাম না, ভালো স্বামী পেলাম না। সন্তানেরা অনেকটা যার যার মতো করে আছে। কিন্তু সঙ্গ দেওয়ার মতো একজন ভালো মানুষ আমি পাইনি, যাকে বলতে পারি এসো, এক কাপ চা খাই, একটু গল্প করি। এটাই হয়তো মানুষের জীবন।" এবার একটু ভাবুন, চিত্রনায়িকা কবরীর কি কোন দিক দিয়ে কম ছিল; যশ, খ্যাতি, অর্থ-বিত্তে? তারপরেও কেন তার এমন আক্ষেপ? এখানে কি টাকা দিয়ে মানুষ কেনা যায় না, একটুকু সুখের প্রত্যাশায়? এখানে কি টাকা দিয়ে নতুন একটি সুখের সংসার কেনা যেত না, একটু প্রশান্তির আশায়? উত্তর; না।কেননা টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না।যেকারণে স্কট বলে গেছেন, অর্থ ও যশ মানুষের জীবনে সব নয়।

 

দ্বিতীয়ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের আচমকা মৃত্যু।মিডিয়ার কল্যাণে জানতে পারলাম মৃত্যুকালে তার পাশে কেউ ছিল না; না সন্তান, না স্ত্রী, না কোন আত্মীয়-স্বজন।একাকী ঘরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।এখন ক'টি প্রশ্ন আমার, উনার অর্থবিত্ত কি কম ছিলো? নাকি উনার হাড়ভাঙ্গা শ্রমের উপার্জনের ভাগ নেওয়ার মানুষ কম ছিলো? এত পরিশ্রম, ত্যাগ- তিতিক্ষার বিনিময়ে জমানো অঢেল অর্থ, গড়া অট্টালিকা, ভালোবাসার জীবনসঙ্গী, অতি আদরের সন্তানেরা সেদিন কোথায় ছিলো?শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে পানি তৃষ্ণায় আঁকিবুঁকি  কথনের একজন সঙ্গীও কেন সেদিন উনার অন্তীমলগ্নে ছিলো না? এখানে কি টাকার অহম শক্তি কাজ করে নি? উত্তর; না। এখানেও টাকার গুরুত্ব ব্যর্থ।টাকা থাকলেই ভালোবাসা কেনা যায় না।টাকা থাকলেও মৃত্যুর ছটফটানিকালে বুকের বামপাশে চেপে ধরার মানুষ মেলানো যায় না।

 

তৃতীয়ত, মোসারাত জাহান (মুনিয়া) নামের এক তরুণীর মৃত্যু।দাবি পরিকল্পিত হত্যা। আসামি বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীর।এ প্রসঙ্গে মিডিয়া ঘেটে জানতে পারলাম দেশে সবচেয়ে রাজ করা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি জনাব সায়েম সোবহান আনভীরের সাথে ঐ তরুণীর দীর্ঘদিন ধরে এক সম্পর্ক ছিলো।ইতিমধ্যে মিডিয়া তুলে ধরেছে যে, প্রতি মাসে এক লক্ষ টাকা ব্যয়ে গুলশান-২ এ একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে রক্ষিত হিসেবে ঐ তরুণীকে রাখতো জনাব সায়েম সোবহান আনভীর।এমনকি ঐ ভদ্রলোক মুনিয়ার কাছে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনে নিয়মিত উল্লেখিত ফ্ল্যাটে যাওয়া-আসা করতো।কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, এই নিউজটি প্রকাশ করে নি বসুন্ধরা গ্রুপের আওতাধীন শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি পত্রিকা ও মিডিয়া; নিউজ ২৪, কালের কন্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ডেইলি সান, বাংলা নিউজ ২৪.কম, ক্যাপিটাল এফ এম, রেডিও ৭১ প্রমুখ।যা নিয়ে ক্রোধ সাধারণ মানুষদের মাঝে।ঘটনা এই।এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে এখানে টাকার কি সম্পর্ক? তবে শুনুন, বলছি।

 

এক. মেয়েটি ছিলো কলেজ পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী।বয়সের অনুপাতে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অপ্রতুল।তবুও পরিবার ছেড়ে সুদূর কুমিল্লা থেকে একাকী চলে আসে ঢাকা।সবার মনে কি প্রশ্ন জাগে না? এ বিষয়ে পরিবারের সম্মতি পেল কিভাবে? পরিবার কি জানতে চায়নি যে কোথায় যাবে? কোথায় থাকবে? কার কাছে যাবে? আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি এমন পরিবার বাংলাদেশে আদৌ নেই।হয়তো পরিবার জ্ঞাত ছিল যে মেয়ে কোথায় যাবে বা যাচ্ছে।আর তারা সব জেনেও নিরব ছিলো কেননা সেখানে চরিতার্থ ছিল টাকা।এখানে টাকার গুরুত্ব অনেক।বলতে গেলে মুনিয়ার জীবনের চেয়েও বেশি! আমার সোনার বাংলাদেশে এমন অনেক মুনিয়াই অগোচরে টাকার কাছে বলি দেয় প্রাণ।তাতে দায় মুনিয়াদের না, দায় মুনিয়াদের পরিবার ও অপর পাশে থাকা হিংস্র মানুষটার।

 

দুই. বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি জনাব সায়েম সোবহান আনভীর।বলার অপেক্ষা রাখে না, তিনি যে অনেক টাকার মালিক।এক লক্ষ টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া যেন তার সামান্য ব্যাপার।ফলে বিয়ে না করা সত্ত্বেও একজন তরূণীকে এভাবে ফ্ল্যাটের পর ফ্লাট দিয়ে হাসিল করেছেন নিজের লালিত স্বার্থ, ইচ্ছা।এ যেন মনে হচ্ছে টাকা ও ইচ্ছা পূরণের যোগসূত্র।ফলে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, তিনি যেন টাকা দিয়ে বিলাসিতা কিনেছেন।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনভীর সাহেব ও মুনিয়ার কিছু ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে।ওখানে আনভীরের দাবি মুনিয়া তার টাকা চুরি করছে কিন্তু কান্না মিশ্রিত কন্ঠে মুনিয়া জবাব দিচ্ছে সে টাকা নেয় নি।এখানেও টাকা মূল পয়েন্ট।এখন প্রশ্ন কি জাগে না, তাহলে কি টাকার জন্য তাদের মধ্যে এমন মনমালিন্য? যে মনমালিন্যে মুনিয়ার জীবন ত্যাগ ও আনভীররের ব্যক্তিত্বে কলঙ্ক?হ্যাঁ, একদম তাই।এখানে টাকা বিলাসিতা এনেছে, টাকা ব্যক্তিত্ব নষ্ট করেছে, আর টাকাই কেড়ে নিয়েছে জীবন।

 

তিন. উল্লেখিত শীর্ষস্থানীয় মিডিয়াগুলো কেন এ নিয়ে রিপোর্ট করে নি? তার প্রসঙ্গে অর্থ বা টাকার ব্যাখ্যা।আমি কিন্তু প্রথমে বলছিলাম, টাকা দিয়ে আইন কেনা যায়, কেনা যায় মানুষ ও জব্দ করা যায় মানুষের কাজ।আবার কেউ কেউ টাকার স্বপ্নে বিক্রি করে দেয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিত্ব বা কেউ কেউ টাকার মৃত্যুর(অর্থ না পাওয়া) ভয়ে গুটিয়ে নেয় হাত-পা।ঠিক যেন তাই।শীর্ষস্থানীয় মিডিয়াগুলো বসুন্ধরা গ্রুপের আওতাধীন চলে।কথায় আছে না, "পেটে খেয়ে যদি পিঠে লাথি মারে তাহলে মায়ের কাছেও নাকি নিজ সন্তান জঘন্য।"সুতরাং বসুন্ধরার খেয়ে যদি বসুন্ধরাকেই দোষারোপ করে উক্ত মিডিয়াগুলো রিপোর্ট করে তাহলে কি তাদের পায়ের নিচে মাটি থাকবে? নিঃসন্দেহে না।কিন্তু প্রশ্ন কি থেকে যায় না যে, তাহলে কি মিডিয়া আজ টাকার কোপে বন্দি? মিডিয়া কি টাকার কাছে বিক্রি হয় বা হার মানে? আমি তো জানতাম মিডিয়া সকল জনগণের স্বার্থে, কোন একক ব্যক্তির স্বার্থে না।তাহলে কি আজ আমার ধারণার মৃত্যু হতে চলেছে? উত্তর; না, আমার ধারণা ঠিক-ই আছে তবে কিছু মিডিয়া টাকার কাছে হেরে গেছে।আর এখানেও কিন্তু টাকার গুরুত্ব অনেক বেশি।

 

অতএব সর্বশেষে আমি এই তিনটি ঘটনার সদৃশ অনেক ঘটনার প্রেক্ষাপটে বলতে পারি, টাকা বহুরূপে বহুমাত্রিক।টাকা পরিবর্তন করে দেয় মানুষের চিন্তাধারা। টাকা পারে অমানুষকে মানুষ বানাতে আবার মানুষকে করতে পারে অমানুষ।তাই টাকা দ্বিপাক্ষিক, যার কাছে যেমন প্রয়োজন তেমন গুরুত্ব, তেমন তার আয়োজন।আসুন টাকার লোভ সংযত করি, সুস্থ জীবন গড়ি।

 


লেখক: জসীম উদ্দিন, শিক্ষার্থী; আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এবং কলাম লেখক ও সাংবাদিক।   

 

Tag

Comments (0)

Comments