/ ধর্মীয়

কথা বলার শিষ্টাচারিতা

সায়েম আহমাদ - রিপোর্টার

আপডেট: 06-04-2021 10:23:00

কথা! এই শব্দটার সাথে পরিচয় নেই এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কথা এটা আমাদের মুখের ভাষা, যা দিয়ে আমরা মনের ভাব প্রকাশ করে থাকি। তবে কেউ চাইবে না আপনি তাকে, তার নিজের কথা বলার ধরণ বা সিষ্টেম নিয়ে কোনো মন্তব্য করেন। এটা মনুষ্য রোগ ও বলা যায় বটে। ব্যক্তির ব্যাবহার কতটা মাধুর্যপূর্ণ তা প্রকাশ পাবে তার কথা কিংবা বচন ভঙ্গিমার মাঝেই।

মনে করুন আপনি কাউকে শুধরানোর জন্য একটা উপদেশ দিলেন,এমন কম সংখ্যক ব্যক্তিবর্গ আছে যারা আপনার এই উপদেশ হজম করতে পারবে। কারন খাবারের হজম শক্তি ভালো হলেও, উপদেশ সহ্য করার হজম শক্তি অনেকেরই থাকে না।

কিভাবে কথা বলতে হবে এই শিক্ষা আমাদেরকে দিয়েছেন ইসলাম, আমাদের আদর্শীক মহা মানব হযরত মুহাম্মদ (সা.)। আমরা ইসলামের ইতিহাস থেকে জানতে পারি, অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। একমাত্র রাসূল (সা.) এর সুন্দর ব্যাবহার ও মহানুভবতা দেখেই। যেমন একদা রাসূল (সা.) মসজিদে বসে সাহাবীদের উদ্দেশ্যে কথা বলছিলেন, সেই অবস্থায় এক ইহুদী মসজিদে বসেই প্রস্রাব করতে শুরু করলো।

কিছু সাহাবী রাগান্বিত হলেও,রাসূল (সা.) বললেন তাকে বাধা দিও না, তাকে কাজটা সম্পন্ন করার সুযোগ দাও। কাজটা শেষ করার পরে রাসূল (সা.) তাকে সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে বললেন, তখন সে বুঝতে পারলো এটা তার ভুল ছিলো। এর পরেই সেই ব্যক্তি ইসলাম গ্রহন করলেন।

এটাই হচ্ছে সুন্দর ব্যাবহার। মনে করুন এক ব্যাক্তি একটা কাজ করেছে, তবে কাজটা আপনার পছন্দ হয় নি। এখন আপনি তাকে যত সুন্দর করে জিজ্ঞাসা করতে পারবেন,ঠিক ততটাই উত্তম হবে আপনার জন্য। কারণ সে যদি এটা ভুলও করে থাকে তাহলে আপনার সুন্দর জিজ্ঞাসাবাদের কারনে আবারো কাজটা করবে এবং সুন্দর করে করার চেষ্টা করবে।

এতে উভয়ে উপকৃত হবে। কিন্তু পক্ষান্তরে কেউ যদি অসুন্দর ব্যাবহারের মাধ্যমে জিজ্ঞাসা করে তাহলে সেটা কখনোই সুন্দর হবে না। বরং যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে সেই ব্যক্তিও ব্যথিত হবেন,এবং আপনার এই কাজ পরবর্তীতে সে আর করতে সম্মতি প্রকাশ করবে না। এটাই হচ্ছে ব্যবহার।

রাসূল (সা.) আমাদের উত্তম আদর্শ। তাই আমরা তার জীবন থেকেও শিখবো কিভাবে কথা বলতে হয়।

কথাবার্তা ও আলাপচারিতায় মানুষের ব্যক্তিত্বের ছাপ ফুটে ওঠে। তার শিক্ষা ও শিষ্টাচার, রুচি ও ব্যক্তিবোধ, মন ও চিত্ত-মানসিকতা স্পষ্ট হয়। যুতসই শব্দচয়ন, বিশুদ্ধ উচ্চারণ, মিষ্টি ভঙ্গি ও বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপনা একজন মানুষকে অনন্য গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয় সবার মাঝে।

আবার অসংযত ও অযাচিত কথাবার্তা জীবনে বয়ে আনে দুর্যোগ। তাই ইসলামের নির্দেশনা হলো- মানুষ তার কথায় সংযত হবে, উত্তম ভাষায় মার্জিত ভঙ্গিতে কথা বলবে। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার জীবন ও আদর্শের মাধ্যমে আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়েছেন।

কথার আগে ছোট-বড় সবাইকে সালাম দিতেন কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে রাসুল (সা.) প্রথমে সালাম প্রদান করতেন। অতপর তিনি কথা বলতেন। এ প্রসঙ্গে হাদিসে হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আগে সালাম পরে কথা।

(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৮৪২)

নবী করিম (সা.) ছোট-বড় সবাইকে সালাম দিতেন এবং প্রথমে সালাম দিতেন।

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে পথ চলছিলেন। তখন রাসুল (সা.) কয়েকটি শিশুকে অতিক্রম  করছিলেন। তিনি তাদেরকে সালাম করলেন। (মুসলিম, হাদিস: ৫৭৯৩)

হাসিমুখে কথা বলতেন রাসুলুল্লাহ (সা.) সব সময় হাসিমুখে কথা বলতেন। তিনি কখনও মুখ কালো করে থাকতেন না। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ-ব্যথাগুলো তার কথা ও আচরণে প্রকাশ পেতো না। আবদুল্লাহ ইবনে হারেস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) অপেক্ষা অধিক মুচকি হাসতে আর কাউকে দেখি নি।

(মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৭৭৪০)

জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে রাসুল (সা.) আমাকে তার দরবারে উপস্থিত হতে বাঁধা দিতেন না এবং আমাকে দেখলেই তিনি মুচকি হাসতেন।

(বুখারি, হাদিস: ৩৮২২)

অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.) সবসময় হাসিমুখে থাকতেন এবং মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন।

সবসময় বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন প্রিয় রাসুলুল্লাহ (সা.) সবসময় বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন। তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও আলংকারিক ভাষার কৃতিত্বধারী। তার শব্দ ও বাক্য, উচ্চারণ ও ভঙ্গিমা সবকিছুই ছিলো- বিশুদ্ধতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ; বরং বলা যায় সাহিত্যের উত্তম নিদর্শন। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ছিলেন আরবের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ভাষী। ’ (কানজুল উম্মাল, হাদিস: ৩৫৪৭১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) কথা বলার সময় যেমন তাড়াহুড়া করতেন না, তেমনি এতো ধীরে বলতেন না যাতে কথার ছন্দপতন হয়। বরং প্রতিটি কথা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) তোমাদের মতো এক নাগাড়ে তাড়াহুড়া করে কথা বলতেন না; বরং তিনি প্রতিটি কথা পৃথক পৃথক স্পষ্ট ভাষায় বলতেন। যাতে তার পাশে উপবিষ্ট ব্যক্তিরা তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে।  (তিরমিজি, হাদিস: ৩৬৩৯)

রাসুলে আকরাম (সা.) যখন কোনো মজলিসে কথা বলতেন, তখন গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো তিনবার পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি করতেন। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সা.) তার কথাকে তিনবার পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি করতেন, যেনো তা ভালোভাবে বোঝা যায়। (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস: ২২২)

পরিশেষ: রাসূল (সা.) এর আদর্শ অনুযায়ী কথা বলতে হবে। এবং হাসিমুখে বলার চেষ্টা থাকতে হবে। আপনার কথাই আপনাকে সন্মানের আসনে সমাসীন করবে আবার আপনার কথাই আপনাকে অপমানিত করবে।

রাশেদ নাইব

কবি, প্রাবন্ধিক 



Comments (0)

Comments